ফের বৃষ্টিতে ভিজে বাসে উঠতে খানিকটা ভিজে যাই। সামনে থেকে পেছনে চোখ বুলাই। খালি কোন সিট চোখে পড়েনা। ফের অনুসন্ধানী দৃষ্টিতে নজর দিই। মাঝ বরাবর একটা সিট খালি মনে হল। পাশে গিয়ে দেখি একটি মেয়ের পাশের সিট খালি। দূরের জার্নি ,বসার একটা ব্যবস্থা করতে হবে ভেবে প্রশ্ন ছুড়ি- আপনার সাথে কেউ আছেন?
জ্বীনা।
আমি বসি?
হ্যা বসুন।
ধন্যবাদ।
পরণের কাপড় ভিজা তাই যথেষ্ট দূরত্ব বজায় রেখে সিটের বাইরের দিকে পা দিয়ে বসি।আমার পরে আরো কয়জন বাসে উঠে কন্টাক্টর সহ তাদের কেউ কেউ সামনে পেছনে যাওয়াতে আমাকে বারবার নড়ে চড়ে বসতে হয়। বার বার আমাকে এমন করতে দেখে বলে- আপনি সোজা হয়ে বসুন। আরেকটু চেপে জানলার পাশে বসার ব্যর্থ চেষ্টা করেন তিনি।
না না ঠিক আছে আমার পরণের কাপড় খানিকটা ভেজা কিনা তাই।
বাইরে প্রচন্ড বৃষ্টি। রাস্তা খারাপ। বাস চলার অবস্থা দেখে মনে হচ্ছে নৌকায় করে যাচ্ছি। বাস যখন বড় গর্তে পড়ে পাশের যাত্রীর গায়ে হেল পড়া ছাড়া কোন উপায় থাকেনা। কখনো আমি পাশের যাত্রীর উপর গিয়ে পড়ি আবার কখনো উনি।
বৃষ্টি থামেনা, রাস্তার অবস্থাও একই। চলার গতি বলতে খুড়িয়ে চলা।।
বাসের গড়াগড়িতে উপর থেকে একটা ব্যাগ আমার পায়ের উপর পড়ে।হালকা ব্যাগ। মনে হল কিছু কাপড় চোপড় হবে। ব্যাগটা পড়ার পরই পাশের যাত্রী সরি বলে কেঁপে উঠে। ধারণা হয়তোবা ব্যাথা পেয়েছি। আমি তাৎক্ষণিক জবাব দিই না সমস্যা নেই। আমি উঠে ফের সেটা যথাস্থানে রাখি। বসতে গিয়ে দুজনার চোখে চোখ পড়ে। খানিকাটা অপ্রস্তুত হয়ে পড়ি উভয়েই। সেটাকে সামলে নিতে জানতে চাই
আপনি যাচ্ছেন কোথায়?
কুমিল্লায়। আপনি?
আমিও ।
কিছুটা ক্লান্ত মনে হল তাকে। দিনের ক্লান্তি শেষে হয়তো বাসায় ফিরছে।আর কথা বাড়াতে চাইনি। কথা তুলে সে ই।
আপনার বাসা বুঝি কুমিল্লায়?
না, এক বন্ধুর বিয়েতে যাচ্ছি।
আমি যাচ্ছি এক কাজিনের বিয়েতে।
তাই ? শহরেই নাকি?
জ্বী।
একটা ভাঙ্গা ব্রিজের কাছে বাস থেমে পড়ে। অঝর ধারায় বৃষ্টি হচ্ছে । ঘোর অন্ধকারে কিছুই দেখা যায়না। মনে মনে খুব ভয় পাচ্ছি কখনো না আবার বাস রাস্তা ছেড়ে খাদে পড়ে যায়।
পাশের যাত্রী তার হাত ব্যাগে কী যেন খুঁজে। ব্যাগের এপাশ ওপাশ তন্ন তন্ন করেও কাঙ্খিত বস্তুটি খুজে পায়না। তাকে কিছুটা উদ্বিগ্ন মনে হয়। জানতে চাই- কোন সমস্যা হল নাকি?
না, মানে মোবাইলটা খুজেঁ পাচ্ছিনা।
আছে হয়তোবা কোন ফাঁক ফোকরে।
না ব্যাগে নেই দেখছি।
কোথাও পড়ে যায়নি তো? কিংবা বাসায় রেখে এসেছেন কিনা।
ঠিক মনে পড়ছেনা।
আমার মোবাইলটা বাড়িয়ে দিলাম- একটা ফোন করে দেখুন কি অবস্থা।
প্রথম দুইবার রিং হলেও কেউ ধরেনি। তৃতীয় কলের সময় একজন রিসিভ করে জানায় যে মোবাইল বাসায় রেখে এসেছে। তখনই মনে পড়ে কলেজ থেকে ফিরে মোবাইল চার্জে দিয়েছিল। তাড়াহুড়া করে বের হবার সময়ে আর মনে ছিলনা।
প্রায় আধ ঘন্টা সময় ব্যয় করে ভাঙা ব্রীজটা পেরোয়। আবার খুড়িয়ে চলতে শুরু করে বাস । মাঝে মাঝে বাসের ঝাকুনিতে পাশের যাত্রী আমার গায়ে হেলে পড়ে। রাত ঘনিয়ে আসার সাথে তার ক্লান্তিও ভর করেছে শরীরে। হেলে পড়াটা তার কাছে খানিকটা বিব্রতকর লাগছে। বিষয়টি আচঁ করতে পেরে তাকে স্বাভাবিক করতে জানতে চাই
আপনি মনে হয় বেশ ক্লান্ত।
হ্যা সকাল আটটায় বাসা থেকে বেরিয়েছি। ক্লাশ করেছি চারটা। শেষ বিকেলে একটা এসাইনমেন্ট ছিল। বাসায় ফিরে কিছু নাকে মুখে গুজে রওয়ানা দিতে হয়েছে।বাস স্ট্যান্ড এ পৌছতেই সন্ধে হয়ে আসে। এত ধকলের পর যাবার ইচ্ছে ছিলনা। কয়দিন বাদে পরীক্ষা।কিন্তু বারবার সে ফোন করছে,তাই....
আমি যার বিয়েতে যাচ্ছি অনেক দিন ধরে আমাদের দেখা নেই। কেবল মোবাইলে যোগাযোগ। বলেছে আমি না গেলে গাল ফুলিয়ে বসে থাকবে।
তাই নাকি? তাহলেতো আপনারা দারুণ বন্ধু!
তা বলেত পারেন।
আমার মোবাইলটা বেজে উঠে। ওই প্রান্ত থেকে জানতে চায় আমি কোথায় আছি। উত্তর দিই বাসে । কয়েক ঘন্টার মধ্যেই পৌছে যাব। কলটা শেষ হতেই পাশের জন অনুরোধ করেন
মোবাইলটা একটু দিবেন প্লিজ- কাজিনটা হয়তো আমাকে খুঁজ করছে না পেয়ে চিন্তা করবে, তাকে একটু জানিয়ে দিই।
সাগ্রহে মোবাইলটা বাড়িয়ে দিই।
প্রথমবার রিং হতেই অন্য প্রান্ত থেকে ভেসে আসে- মৃদুল কোন সমস্যা?
আমি মৃদুল না,অনন্যা।
অনন্যা?
আমার পাশে একজন আছেন উনার কাছ থেকে মোবাইল চেয়ে নিয়েছে তোমাকে জানানোর জন্য।
এটা তো মৃদুলের নম্বর। একটু আগে কথা হয়েছে আমার সাথে। তুই কি তার সাথে নাকি?
হ্যা।
শোন ও আমার বন্ধু। কোন চিন্তা করিসনা। রাখি।
ফোনটা আমাকে ফেরত দিতে জানতে চায়- আপনি চৈতালির বিয়েতে যাচ্ছেন?
আমি একটু অবাক হলাম। জ্বী, আপনি চেনেন নাকি?
আমিতো তার বিয়েতই যাচ্ছি! কিভাবে মিলে গেল! ভালই হল। রাত হয়ে যাওয়াতে আমি চিন্তিত ছিলাম।
এবার অনন্যা কিছুটা স্বাচ্ছন্দবোধ করে।আলাপে মত্ত হতে চায় কিন্তু ক্লান্তিতে চোখ বুঝে আসে। জোর করে চোখ খুলে রাখার ব্যর্থ চেস্টা করে। পরে আলাপ করা যাবে আপনি একটু বিশ্রাম নিন বলে কথার ইতি টানি।
ক্লান্তি আর বাসের ঝাকুনিতে অল্প সময়ের মধ্যেই ঘুমের রাজ্যে হারিয়ে যায় অনন্যা। বাসের প্রবল ঝাকুনিতে জেগে থেকেই শরীরের ভারসাম্য বজায় রাখা দায়; ঘুমিয়েতো সেটা অবান্তর। ঘুমের ঘোরে অনন্যার মাথা এসে ঠেকে আমার ঘাড়ে।
বাসের ঝাকুনিতে মাঝে মাঝে আমার কাধ ছেড়ে কখনো জানলার দিকে হেলে পড়ে ফের আমার কাধেঁ। হঠাৎ প্রচন্ড এক ঝাকুনির চোটে অনন্যা আমার কোলে হেলে পড়ে।
রাত গভীর হয়;পাল্লা দিয়ে বাড়ে বৃষ্টি। ভাঙ্গা রাস্তা আর বৃষ্টির কারণে দুই ঘন্টা লেটে আমরা কুমিল্লায় পৌছি।
অন্যানা ঘুম থেকে জেগে দেখে আমার বাহুডুরে আবদ্ধ। ধড়ফর করে উঠে বসে। লজ্জায় কুকরে যাবার মত অবস্থা। কেমন করতে থাকে। স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরিয়ে আনতে বলি-বিব্রত হবার কিছু নেই, আপনার ঘুম ব্যঘাত ঘটবে বলে জাগাইনি। চলুন নামার সময় সময় হয়েছে।
রাত তখন এগারটা প্রায়। বিদ্যুৎ বিহীন শহরে নিকষ অন্ধকার। একটা রিক্সায় উঠি দু’জন। বাসের রেশটা তার মধ্যে অনুভব করি তখনও। জড়োসড়ো হয়ে বসে । আমি ফের........।
আমি বাসা চিনিনা। অনন্যা একবার এসেছিল অনেক পূর্বে। ফোন দিই লোকেশন জানার জন্য। ওই প্রান্ত থেকে হ্যালো বলতেই চার্জের অভাবে মোবাইল খানা বন্ধ হয়ে যায়। পড়ি মহা চিন্তায়। নতুন ড্রাইভার। অন্ধকারে পথ চলতে গিয়ে সে ঝাউতলার পরিবর্তে বাদুরতলায় চলে যায়। এ যেন মড়ার উপর খড়ার ঘা! অনেক কষ্টে একজনার সহায়তায় সঠিক রাস্তার সন্ধান পাই।
রাজ্যের ক্লান্তি শরীরে নিয়ে বাসায় পৌছি রাত একটায়। হাতমুখ ধুয়ে হালকা মুখে দিয়ে হারিয়ে যাই ঘুমের রাজ্যে।
বাসে উঠার পূর্বে আধঘন্টা বৃষ্টিতে ভিজেছিলাম কথা প্রসঙ্গে জেনেছিল অনন্যা। অনেক বেলা হবার পরেও ঘুম ভাঙছেনা দেখে জ্বর হল কিনা সে শংকায় আমার কপালে হাত বুলায়। ঠান্ডা হাতের স্পর্শে ঘুম ভেঙে যায় আমার। আবারো বিব্রত হয় অনন্যা। মাথা নিচু করে চলে যাবার সময় তাকে থামাই। কী ব্যাপার কিছু বলতে এসেছিলেন নাকি? বসুন না।
থতমত খেয়ে যায় - না না আমি ভাবলাম কাল বৃষ্টিতে ভিজে শরীরে কোন সমস্যা হল কিনা।
অভয় দিয়ে বলি বৃষ্টিতে ভিজলে আমার কোন সমস্যা হয়না।
অন্যনা চলে যাবার জন্য ব্যাকুল হয়ে উঠে। আপনি হাত মুখ ধুয়ে আসুন, নাস্তা রেডি।
খাবার টেবিলে বসেই চৈতালি খোচাটা দেয়- কত মেয়ে পিছনে ঘুর ঘুর করেছে কারোর দিকে যে ফিরেও তাকায়নি সে কিনা প্রথম দর্শনেই কোলে.......
লজ্জায় রাঙা লাল হয়ে অনন্যা মাথা নিচু করে উঠতে উঠতে বলে কাজটা তুমি ভাল করনি।
পেছন থেকে ওড়নার আচঁল ধরে টান দিয়ে তাকে থামায় চৈতালি। আরে বস, লজ্জার কি হল। দেখতে হবেনা কাজিনটা কার? দেখতে যেমন মনটাও তেমন আমিও মৃদুলের জন্য এমন একটা মেয়েই খুঁজছিলাম। আচ্ছা মৃদুল অনন্যাকে তোমার পছন্দ হয়েছে?
দৌড় দিয়ে রোম ছেড়ে চলে যায় অনন্যা।
বাড়ির কারোরই কোন ফুসরত নেই। কেউ ব্যস্ত আগত অতিথিদের বরণ করা নিয়ে; প্রয়োজনীয় জিনিস পত্র সব কেনা হল কিনা কেউ খবর নিচ্ছে, কেউ আবার ব্যস্ত হয়ে পড়েছে বিয়ের আনুষ্ঠানিকতা নিয়ে। আমি ঘুরে ঘুরে সব দেখি।
দোতলা থেকে নামার পথে সিড়িতে দেখা মেলে অনন্যার। হাতে শরবতের গ্লাস। বুঝতে পারি আপ্যায়নে মশগুল। কাছাকাছি আসতেই মুখোমুখি দাড়াই দু’জন। নির্বাক কিছুটা সময় পেরিয়ে যায়। কারোর চোখেরই পলক পড়েনা। কেউ একজন পাশ কাটিয়ে যাবার সময় সম্বিৎ ফেরে । কি বলব কিছু ভাবার পূর্বেই মুখ থেকে বেরিয়ে আসে- কেমন আছেন?
ভাল, আপনি কেমন আছেন?
ভাল।
অনন্যা তার শরবতের গ্লাসটা আমার দিকে বাড়িয়ে দেয়।আমার জন্য নয় তাই নিতে সংকোচ বোধ করে বলি- ধন্যবাদ, যার জন্য নিচ্ছিলেন তিনি অপেক্ষা করছেন ,আপনি যান।
না আপনি নেন আমি আবার নিয়ে আসব।
গ্লাসটা নিয়ে এক চুমুকেই শেষ করে ফেলি। আমার শরবত পান দেখে প্রশ্ন করে -আরেক গ্লাস এনে দিব?
না না আর লাগবেনা-গ্লাসটা বাড়িয়ে দিলাম তার দিকে।
দুই জোড়া চোখ ছিল চোখের পানে নিবিষ্ট। আমি গ্লাস অনন্যার হাতে দিয়ে ছিলাম কিনা কিংবা অন্যনা সে গ্লাস ধরেছিল কিনা সে খেয়াল কারোর ছিলনা। খেয়াল হয় গ্লাস ভাঙ্গার আওয়াজ শুনে।
কমিউনিটি সেন্টার থেকে চলে আসি।চৈতালিদের বাসায় আর যাওয়া হয়না।
ঠিকানা বদলের মত চৈতালি তার ফোন নম্বরটাও বদলে ফেলে। একদিন জানিয়েছিল ফোন করে। বে খেয়ালে সেটা স্মৃতিতে ধরে রাখা হয়নি। স্ব-স্ব ব্যস্ততায় আমাদের যোগাযোগটা তলানিতে গিয়ে ঠেকে।
সময় বয়ে চলে নিজস্ব গতিতে।তার সাথে পাল্লা দিয়ে চলি আমিও। পড়াশুনা শেষে একটা চাকুরী ও জুটে যায়।
মা বাবার আশীর্বাদ নিয়ে চাকুরীতে যোগদানের উদ্দেশ্যে এক বিকেলে রওয়ানা হই। কাউন্টারে বসে বাসের অপেক্ষা করি। বাস আসেনা। আমি প্রতীক্ষা করতে থাকি। সন্ধা ঘনিয়ে আসে। আচমকা আকাশ ভেঙ্গে বৃষ্টি পড়তে শুরু করে। বৃষ্টির ঝটকা বাড়তেই থাকে।
ঘড়ির কাঁটা আটটা ছুই ছুই। একটা বাস এসে কাউন্টারের সামনে দাড়ায়। বৃষ্টির কারণে নেমে যাওয়া যাত্রীরা কাউন্টারের ভেতরে আসতে থাকে। যাত্রীদের ভিড়ে আমার চোখ একজনার দিকে আটকে যায়। আমার দেখার ভুল কিনা তা যখন ভাবছি দেখি আমার দিকেই আসছে।
মৃদুল সাহেব যে, কেমন আছেন?অনন্যা আমার সামনে দাড়িয়ে প্রশ্ন করে।
আমি উঠে দাড়াই। ভাল , আপনি কেমন আছেন?
আমিও ভাল।
দুইটা লাগেজ হাতে একজন সুদর্শন যুবক তার পাশে এসে দাড়ায়। পরিচয় করিয়ে দেয় আমার......।
তার সাথে করমর্দন করি। জায়গা করে দিয়ে বসতে অনুরোধ করি।
বৃষ্টি খানিকটা কমতে শুরু করেছে। অনন্যা বসে। তার স্বামী কিছু কেনা-কাটার জন্য বাইরে বেরিয়ে যায়।
কথা শুরু করে অনন্যা। বিয়ে বাড়িতে ব্যস্ততায় আর কোন কথা হয়নি। পরে যখন খবর নিলাম দেখি আপনি নেই। আপনার ঠিকানা কিংবা ফোন নম্বর কিছুই নেয়া হয়নি। সেখান থেকে ফেরার পর আপনার কোন খবর পাইনি। অনেকবার আপনার কথা মনে পড়েছে। পরীক্ষার ধকলে কেটে যায় কয়েক মাস।
পরীক্ষা শেষে আপনার সাথে যোগাযোগের নিমিত্তে ছুটে যাই চৈতালির কাছে। ততদিনে চৈতালি স্বামীর সাথে পরবাসী হয়ে গেছে। ব্যর্থ হয়ে ফিরে আসি। তারপরও যে চেষ্টা করিনি তা নয় কিন্তু আপনার সন্ধান মেলেনি।
স্কুল কলেজ,বিম্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময়ে অনেকের সাথে দেখা হয়েছে। বন্ধুর সংখ্যাও নেহায়েত কম ছিলনা। কাউকেই ভিন্ন দৃষ্টিতে দেখিনি। আমার জীবনের এক বিশেষ মুহূর্তে বিশেষভাবে আপনাকে পেয়েছিলাম। ভেছিলাম বাকী জীবনটা আপনার সাথেই কাটিয়ে দিব। আপনার জন্য প্রতীক্ষাও করেছি। কিন্তু নিয়তি এক সুতোয় আমাদের বাধতে চায়নি।
অনন্যার কথার মাঝে আমি হারিয়ে যাই। কি ছিল আমাদের সম্পর্ক? দেড় বছর পূর্বে অনান্যার সাথে প্রথম দেখা । তারপর? অনন্যা কি ছিল আমার মনে? একাবারও কি তার খোঁজ নিয়েছি? আজ এ ভাবনা মনে এনে কি হবে? প্রশ্নের উত্তরইবা খুঁজে কি লাভ?
থাক এসব কথা। আপনার কথা বলুন।
ভাবনার ঘোর ভাঙে তার কথায়।
কাউন্টারের এজন দেখি আমার সামনে দাড়িয়ে আছে। স্যার, আপনার বাস চলে এসেছে।
আমি বাসে উঠে পড়ি ।
স্লামালেকুম। আসতে পারি?
রিসিপশনে বসা অনুর্ধ পঁচিশ বছরের রমনী আহ্বান জানায়,'হাঁ আসুন'।
আমীর উদ্দিন তার কাছে গিয়ে দাড়ায়।তিনি আসার হেতু জানতে চান। কন্ঠে বলে'পত্রিকায় আপনাদের একটা বিজ্ঞাপন দেখে এসেছি'। তার জড়তা কাটতে চায়না।
ও হ্যাঁ,এটা শিক্ষিত বেকারদের জন্য আমাদের একটি স্পেশাল কোর্স; তিনমাসের কোর্স। প্রশিক্ষণ দেয়া হবে পাশাপাশি থাকা খাওয়ার জন্য প্রথম মাসে ২০০০,দ্বিতীয় মাসে ৩০০০,তৃতীয় মাসে ৪০০০ টাকা করে দেয়া হবে। পরবর্তীতে চাকুরী হয়ে গেলে মাসে ৫০০০ টাকা সেলারি পাবেন। এক কাজ করুন ২০০ টাকা আর এককপি ছবি দেন,আমি একটা ফরম দিচ্ছি;এখানে একটা স্বাক্ষর করেন। এক ঘন্টা পরে এসে খোঁজ নিবেন।
নিজেকে ভাগ্যবান মনে করে আমীর উদ্দিন,চাকুরী তাহলে একটা জুটে গেল! ছবি , টাকা আর একটা ফরমে সই দিয়ে বেরিয়ে আসে।
কারওয়ান বাজার থেকে হাঁটতে হাঁটতে সোনারগাও হোটেলের সামনে এসে দাড়ায়। নিবিষ্ট চিত্তে খুটিয়ে দেখতে থাকে বিল্ডিংটাকে। সে শুনেছে এখানে খেতে গেলে অনেক টাকা বিল দেয়া লাগে। ভাবে চাকুরীটা হয়ে গেলে এদিন এই হোটেলে এসে....। পূর্ব দিকের রাস্তা ধরে হেটে এফডিসির সামনে আসে।অনেক লোকের জটলা দেখে সেও দাড়ায়।কতক্ষণ পর পর গাড়ি ভিতরে যায় আবার বের হয়।বেশিরভাগ গাড়িই কাল গ্লাসের; ভেতরে কিছুই দেখা যায়না।
পেছনে সরানোর উসিলায় আচমকা এক লোক তাকে সম্মুখ দিক থেকে ধাক্কা দেয়।সময় পেরিযে যাচ্ছে ভেবে আর দাড়ায়না। কারওয়ান বাজারে চলে আসে। এখানে এসে জানতে পারে তার চাকুরী হবে,ভর্তি ফি বাবদ তিন হাজার টাকা দিতে হবে।
মাত্র কয়েশ টাকা আছে তার কাছে।বিনীত কন্ঠে শূধায়'আমার কাছে টাকা নেই,আপনারা প্রশিক্ষণ ভাতা বাবদ যে টাকা দেবেন তার থেকে যদি....।'এটা আমাদের ফি প্রশিক্ষণে যা পাবেন তার সাথে এটার কোন সম্পর্ক নেই। ঠিক আছে ,আপনি বাড়ি চলে যান , যেদিন টাকা নিয়ে আসবেন সেদিনই আপনাকে নিয়োগ দিয়ে দিব।
আমীরউদ্দিন বেরিয়ে আসে। ফরম বাবদ যে টাকাটা দিয়েছিল তা ফেরত চাওয়ার ভাষা তার মুখ দিয়ে বের হয়নি। একটি রেস্টুরেন্টএ গিয়ে কিছু খেয়ে বিল দেবার সময় দেখে বুক পকেটে থাকা টাকা গুলো নেই! বুঝতে বাকী থাকেনা এফডিসির সামনের ধাক্কাটা টাকা নেওয়ার মূল হোতা।
ইস্কাটন রোডে আসে। অনেক খুজেঁ একটি ঔষধ কোম্পানীর অফিস বের করে সেখানে গিয়ে দেখে ১০০ টাকা দিয়ে নাম নিবন্ধন করতে হবে।দুটি প্রতিষ্ঠানকে একই মনে করে বাড়ি চলে আসে।
আমীর উদ্দিন বিএ পাশ করেছে দুই বছর হতে চলল। নিম্মবিত্ত পরিবারের ছেলে সে। বাবার নিজের জমি নেই। অন্যের জমি বর্গা চাষ করে।অনেক কষ্ট হয়েছে তাকে পড়াতে। তার জন্য ছোট বোনটাকে বেশি পড়াতে পারেনি। অল্প বয়সে বিয়ে দিতে হয়েছে।
চাকুরীর জন্য মরিয়া হয়ে উঠে আমীর উদ্দিন। নিয়মিত পত্রিকা পড়তে পারেনা। শুক্রবারে কেবল পত্রিকা রাখে। মাঝে মাঝে কলেজে একপাক ঘুরে আসে কেবল পত্রিকায় নতুন কোন চাকুরীর বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ হয়েছে কিনা দেখার জন্য। প্রায়ই আশাহত হয়ে ফিরতে হয়,আবার কোন দিন কলেজে গিয়ে দেখে বিজ্ঞপ্তির অংশটুকু কে বা কারা কেটে নিয়ে গেছে।
চাকুরী দেয়ার ক্ষেত্রে সরকারী ও বেসরকারী প্রতিষ্ঠানের মধ্যে কোন ভিন্নতা দেখেনা সে। সরকারী প্রতিষ্ঠানে আবেদন জমা নেয়ার আগেই কিছু টাকা নিয়ে নেয় আর বেসরকারী প্রতিষ্ঠান নেয় ভিন্ন ছলে। কোনটার প্রতিই তার আস্থা নেই।তবু পত্রিকায় বিজ্ঞপ্তি দেখলে আগ্রহী হয়ে আবেদন করে। তার যে একটা চাকুরী দরকার।
একটি সরকারী প্রতিষ্ঠানে চাকুরীর জন্য পরীক্ষা দিতে যায়।প্রবেশপত্রে সেদিনই ফলাফল দেয়ার কথা থাকলেও কর্তৃপক্ষ পরবর্তীতে জানাবে বলে নোটিশ দিয়ে দেয়। দীর্ঘদিন কোন পত্রের দেখা মেলেনা।
ছয় মাস পর ভাইভা পরীক্ষার জন্য ডাকা হয়। এবার হয়তোবা তার চাকুরীটা হয়ে যাবে ভরসায় ভালভাবে প্রস্তুতি নিয়ে গিয়ে দেখে যারা রিটেন পরীক্ষা দিয়েছিল তাদের সবাইকেই ডেকেছে। এ প্রহসনের মানে সে বুঝেনা।সরকারী চাকুরীর প্রতি আস্হা পুরোপুরি হারিয়ে ফেলে।
নতুন একটি ঔষধ কোম্পানীর বিজ্ঞাপন দেখে আগ্রহী হয়ে একদিন আবেদন নিয়ে হাজির হয় নোয়াখালী। ট্রেন থেকে নামার সময় ঘটে এক ভয়ানক কান্ড। টিউশনির দেড়শ টাকা নিয়ে বাড়ি থেকে বের হয়েছিল। সাথে পকেট কোনে আরো দুই টাকা। ত্রিশ টাকায় টিকেট কাটে। নোয়াখালী স্টেশনে গাড়ী থামার পর দেখে ফ্লাটফর্মের দিকের দরজাটা বন্ধ।বার কয়েক চেষ্টা করে খুলতে না পেরে পরের কামরা দিয়ে নামার জন্য পা বাড়ায়। যেই নামতে যাবে, মোবাইল কোর্টের লোকজন তাকে আটক করে। প্রথম শ্রেনীতে উঠার দায়ে ১২০ টাকা আদায় করে নেয়। হতভম্ব হয়ে স্টেশন ত্যাগ করে অনেক খোঁজাখুজি করে কাঙ্খিত ঠিকানায় গিয়ে দেখে তা বন্ধ। সেদিন রোজা শেষে দুই টাকার মুড়ি কিনে ইফতারী করে যখন বাড়ি ফিরে রাত অনেক হয়ে যায়।
একটি সরকারী প্রতিষ্ঠানে বেশ কিছু লোক নিয়োগের জন্য বিজ্ঞপ্তি দেয়। ফের আবেদন করে। অনেক দিন পার হয় ইন্টারভিউ কার্ড আসেনা। আসেনা তো আসেনা।এরি মাঝে আরেকটি সরকারী প্রতিষ্ঠানে আবেদন করে। লোক মুখে শুনেছে এই চাকুরী পেতে হলে বড় অংকের টাকা দিতে হবে। টাকা দেয়ার সামর্থ্য তার বাবার নেই। তবু আশায় থাকে।
গ্রামের রাস্তায় বের হলে লোকজন নানা বিরক্তিকর মন্তব্য করে।"দেখ ছেলেটা কত লেখা পড়া করেছে,চাকুরী নাই;আরে এ দেশে মামা দুলাভাই না থাকলে কি আর চাকুরী মেলে? এখন ঘুর। না হালের হয়েছে না হয়েছে জোয়ালের। বাপটা খেটে মরছে উনি নবাবজাদা হয়ে ঘুরে বেড়ান।" এসব শুনতে আর ভাল লাগেনা তাই বাড়ি থেকে বের হওয়া অনেকটা বন্ধ করে দেয়।
একদিন পত্রিকার পাতায় একটি খরব দেখে চোখ আটকে যায় আমীর উদ্দিনের। একটি বেসরকারী ফাউন্ডেশন এইচ এস সি পাশ থেকে শুরু করে এম এ পাশ বেকারদের জন্য বিশেষ এক কর্মসূচী হাতে নিয়েছ। তাদের প্রতিষ্ঠানে চাকুরী করার পাশাপাশি পড়াশোনাও করা যাবে। তাদের পলিসি দেখে আগ্রহী হয়ে আবেদন করে।
তিনটা ইন্টারভিউ কার্ড একসাথে আসে। বুধবার দিন বেসরকারী প্রতিষ্ঠানে সাক্ষাতকার;বৃহস্পতিবার দীর্ঘদিন পূর্বে আবেদন করা প্রতিষ্ঠানের ইন্টারভিউ চট্টগামে আর শুক্রবারে অন্যটার পরীক্ষা কুমিল্লায়। নিজের টিউশনির কিছু টাকা এবং মায়ের কাছ থেকে কিছু নিয়ে রওয়ানা দেয়।
ঢাকায় সাক্ষাতকারের সময় ৪ টা এক ঘন্টা পূর্বেই সেখানে পৌছে। প্রতীক্ষার শেষ হয় সন্ধে সাতটায়। ফাউন্ডেশন প্রধান নাকি অন্য একটি মিটিংয়ে ছিলেন।আমীর উদ্দিনের সাক্ষাতকার শেষে তারা গ্রিন সিগনাল দিয়ে চলে যেতে বলেন। রাতের ট্রেনে চট্ট্রগ্রাম রওয়ানা দেয়।সারারাত না ঘুমিয়ে গাধাগাধি করে বসে থেকে সকালে পৌছে। অচেনা জায়গা চিনতে অনেক কষ্ট হয়। পকেটে অর্থের অভাবে পা দু’টোকেই বাহন বানিয়ে পথ খুঁজতে হয়। দুই ঘন্টা দেরিতে শুরু হওয়া পরীক্ষা শেষ হয় বিকেল ৪ টায়। ফেরত ট্রেন ধরতে হেঁটে পাহাড়তলী আসে। ট্রেন এখানে থামেনা শুনে আবার হেঁটে র্ওয়না দেয় বটতলী স্টেশনে।
রাত আটটায় একপ্রকার যুদ্ধকরে মেইল ট্রেনে উঠে। জীবনে এক নতুন অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হয় এখানে।কিছু দালাল গোছের লোক আগেই ট্রেনে উঠে সিট দখল করে বসে আছে।যাত্রীদের কাছে টাকার বিনিময়ে বিক্রি করে। পুলিশও কম যায়না। তার ও টাকার বিনিময়ে একটি বগিতে লোক তুলছে। দুই দিনের কর্মক্লাতিতে ট্রেনে উঠার পরই ঘুমে চোখ বুঝে আসে। কিন্তু ঘুমাতে পারেনা যদি ট্রেন কুমিল্লা ছেড়ে চলে যায়। রাত একটায় ট্রেন থেকে নামে। চোখের পাশাপাশি শরীরেও ক্লান্তি ঝেঁকে বসে। একটি বিশ্রাম কক্ষে চেয়ারে হেলান দিয়ে ঘুম দিতেই এক পুলিশ ধাক্কা দিয়ে তুলে দেয়। বসার সিটটাও হারায়।
ভারসাসম্যহীন শরীরে ঝিমিয়ে ঝিমিয়ে রাতাটা কাটিয়ে সকালে বৃষ্টিতে কাকা ভেজা হয়ে এক স্কুলে হাজির হয়। তার মত হাজার হাজার চাকুরী প্রার্থী পূর্বেই এসে বসে আছে। মাত্র কয়েকটা পোস্টের জন্য এত প্রার্থী!কার হবে চাকুরী ভেবে পায়না। পরীক্ষা শেষে বাড়ী চলে আসে।
আমীর উদ্দিন মনে মনে আশাবাদী হয়ে উঠে,এবার নিশ্চয় একটা চাকুরী হবে। আশাটাকে একধাপ এগিয়ে দিতে সেই বেসরকারী ফাউন্ডেশন থেকে চিঠি আসে। সেখানে উল্লেখ আছে সে নিবর্বাচিত হয়েছে। সকল মূল সার্টিফিকেট নিয়ে যেতে বলেছে তারা।
সেদিন শুক্রবার। সকালে কাঙ্খিত ঠিকানায় হাজির হয় ।পাঁচজন মানুষ তাকে নানা প্রশ্ন করে। শেষে তারা নিশ্চিত ভাবে জানায় সে নির্বাচিত হয়েছে। চাকুরী করবে পাশাপাশি এম বিএ পড়বে। বেতন হিসেবে মাসে পাঁচ হাজার টাকা দেয়া হবে। সেখান থেকে পড়াশোনার ফি হিসেবে আড়াইহাজার টাকা কেটে নেয়া হবে।দিনের প্রথম দিকে পড়াশোনা করবে বিকেলে করবে চাকুরী। আগামীকালই সে যোগদান করতে পারবে।এ জন্য তাকে প্রথমে পাঁচ হাজার টাকা দিয়ে ভর্তি হতে হবে।
টাকার কথা শুনে ব্যর্থ মনোরথে অফিস ত্যাগ করে।
একপশলা বৃষ্টি হয়।রাস্তা ঘাটেও পানি জমে।
পার্কের এক কোনে একটি বেঞ্চে বসে আমীর উদ্দিন। আজ বড় আশা নিয়ে এসেছিল। এখন আর কিছুই ভাবতে পারছেনা। কেন লেখাপড়া করেছিল ভেবে পাচ্ছেনা। ছোট বেলায় বাবার সাথে কাজে লেগে গেলেই বরং ভাল হত। বাবার উপর ধকলটা কম পড়ত।নানা সব চিন্তা মাথায় ভর করে।
তার সামনে বেশ কিছু পানি জমে আছে।মৃদু বাতাসে পানিতে ছোট ঢেউয়ের সৃষ্টি হয়েছে এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকলে মনে হয় যেন ছোট্ট এক নদী। পানি দেখে ছোট বেলার কথা মনে পড়ে গেল। বর্ষাকালে বৃষ্টির পর যখ তাদের উঠানে পানি জমত কাগজের নৌকা বানিয়ে ভাসাত।বৃষ্টির পানির স্রোতে নৌকাগুলো উঠানের এ মাথা থেকে ওই মাথায় ভেসে বেড়াত। সে স্মৃতি মাথা চারা দিয়ে উঠে। আমীর উদ্দিন হাতের ফাইলটা খুলে একটা করে সার্টিফিকেট বের করে আর একেকটা নৌকা তৈরি করে।একে একে সব গুলো পানিতে ভাসিয়ে দেয়।মৃদু বাতাসের পরশে নৌকাগুলো ধীর গতিতে দূরে চলে যেতে থাকে। আমীর উদ্দিন দেখতে পায় তার মনের জমাট বাধা কষ্টের পাহাড় নিয়ে নৌকা গুলো চলে যাচ্ছে।
স্লামালেকুম। আসতে পারি?
রিসিপশনে বসা অনুর্ধ পঁচিশ বছরের রমনী আহ্বান জানায়,'হাঁ আসুন'।
আমীর উদ্দিন তার কাছে গিয়ে দাড়ায়।তিনি আসার হেতু জানতে চান। কন্ঠে বলে'পত্রিকায় আপনাদের একটা বিজ্ঞাপন দেখে এসেছি'। তার জড়তা কাটতে চায়না।
ও হ্যাঁ,এটা শিক্ষিত বেকারদের জন্য আমাদের একটি স্পেশাল কোর্স; তিনমাসের কোর্স। প্রশিক্ষণ দেয়া হবে পাশাপাশি থাকা খাওয়ার জন্য প্রথম মাসে ২০০০,দ্বিতীয় মাসে ৩০০০,তৃতীয় মাসে ৪০০০ টাকা করে দেয়া হবে। পরবর্তীতে চাকুরী হয়ে গেলে মাসে ৫০০০ টাকা সেলারি পাবেন। এক কাজ করুন ২০০ টাকা আর এককপি ছবি দেন,আমি একটা ফরম দিচ্ছি;এখানে একটা স্বাক্ষর করেন। এক ঘন্টা পরে এসে খোঁজ নিবেন।
নিজেকে ভাগ্যবান মনে করে আমীর উদ্দিন,চাকুরী তাহলে একটা জুটে গেল! ছবি , টাকা আর একটা ফরমে সই দিয়ে বেরিয়ে আসে।
কারওয়ান বাজার থেকে হাঁটতে হাঁটতে সোনারগাও হোটেলের সামনে এসে দাড়ায়। নিবিষ্ট চিত্তে খুটিয়ে দেখতে থাকে বিল্ডিংটাকে।সে শুনেছে এখানে খেতে গেলে অনেক টাকা বিল দেয়া লাগে।ভাবে চাকুরীটা হয়ে গেলে এদিন এই হোটেলে এসে....। পূর্ব দিকের রাস্তা ধরে হেটে এফডিসির সামনে আসে।অনেক লোকের জটলা দেখে সেও দাড়ায়।কতক্ষণ পর পর গাড়ি ভিতরে যায় আবার বের হয়।বেশিরভাগ গাড়িই কাল গ্লাসের; ভেতরে কিছুই দেখা যায়না।
পেছনে সরানোর উসিলায় আচমকা এক লোক তাকে সম্মুখ দিক থেকে ধাক্কা দেয়।সময় পেরিযে যাচ্ছে ভেবে আর দাড়ায়না। কারওয়ান বাজারে চলে আসে। এখানে এসে জানতে পারে তার চাকুরী হবে,ভর্তি ফি বাবদ তিন হাজার টাকা দিতে হবে।
মাত্র কয়েশ টাকা আছে তার কাছে।বিনীত কন্ঠে শূধায়'আমার কাছে টাকা নেই,আপনারা প্রশিক্ষণ ভাতা বাবদ যে টাকা দেবেন তার থেকে যদি....।'এটা আমাদের ফি প্রশিক্ষণে যা পাবেন তার সাথে এটার কোন সম্পর্ক নেই। ঠিক আছে ,আপনি বাড়ি চলে যান , যেদিন টাকা নিয়ে আসবেন সেদিনই আপনাকে নিয়োগ দিয়ে দিব।
আমীরউদ্দিন বেরিয়ে আসে। ফরম বাবদ যে টাকাটা দিয়েছিল তা ফেরত চাওয়ার ভাষা তার মুখ দিয়ে বের হয়নি। একটি রেস্টুরেন্টএ গিয়ে কিছু খেয়ে বিল দেবার সময় দেখে বুক পকেটে থাকা টাকা গুলো নেই! বুঝতে বাকী থাকেনা এফডিসির সামনের ধাক্কাটা টাকা নেওয়ার মূল হোতা।
ইস্কাটন রোডে আসে। অনেক খুজেঁ একটি ঔষধ কোম্পানীর অফিস বের করে সেখানে গিয়ে দেখে ১০০ টাকা দিয়ে নাম নিবন্ধন করতে হবে।দুটি প্রতিষ্ঠানকে একই মনে করে বাড়ি চলে আসে।
আমীর উদ্দিন বিএ পাশ করেছে দুই বছর হতে চলল। নিম্মবিত্ত পরিবারের ছেলে সে। বাবার নিজের জমি নেই। অন্যের জমি বর্গা চাষ করে।অনেক কষ্ট হয়েছে তাকে পড়াতে। তার জন্য ছোট বোনটাকে বেশি পড়াতে পারেনি। অল্প বয়সে বিয়ে দিতে হয়েছে।
চাকুরীর জন্য মরিয়া হয়ে উঠে আমীর উদ্দিন। নিয়মিত পত্রিকা পড়তে পারেনা। শুক্রবারে কেবল পত্রিকা রাখে। মাঝে মাঝে কলেজে একপাক ঘুরে আসে কেবল পত্রিকায় নতুন কোন চাকুরীর বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ হয়েছে কিনা দেখার জন্য। প্রায়ই আশাহত হয়ে ফিরতে হয়,আবার কোন দিন কলেজে গিয়ে দেখে বিজ্ঞপ্তির অংশটুকু কে বা কারা কেটে নিয়ে গেছে।
চাকুরী দেয়ার ক্ষেত্রে সরকারী ও বেসরকারী প্রতিষ্ঠানের মধ্যে কোন ভিন্নতা দেখেনা সে। সরকারী প্রতিষ্ঠানে আবেদন জমা নেয়ার আগেই কিছু টাকা নিয়ে নেয় আর বেসরকারী প্রতিষ্ঠান নেয় ভিন্ন ছলে। কোনটার প্রতিই তার আস্থা নেই।তবু পত্রিকায় বিজ্ঞপ্তি দেখলে আগ্রহী হয়ে আবেদন করে। তার যে একটা চাকুরী দরকার।
একটি সরকারী প্রতিষ্ঠানে চাকুরীর জন্য পরীক্ষা দিতে যায়।প্রবেশপত্রে সেদিনই ফলাফল দেয়ার কথা থাকলেও কর্তৃপক্ষ পরবর্তীতে জানাবে বলে নোটিশ দিয়ে দেয়। দীর্ঘদিন কোন পত্রের দেখা মেলেনা।
ছয় মাস পর ভাইভা পরীক্ষার জন্য ডাকা হয়। এবার হয়তোবা তার চাকুরীটা হয়ে যাবে ভরসায় ভালভাবে প্রস্তুতি নিয়ে গিয়ে দেখে যারা রিটেন পরীক্ষা দিয়েছিল তাদের সবাইকেই ডেকেছে। এ প্রহসনের মানে সে বুঝেনা।সরকারী চাকুরীর প্রতি আস্হা পুরোপুরি হারিয়ে ফেলে।
নতুন একটি ঔষধ কোম্পানীর বিজ্ঞাপন দেখে আগ্রহী হয়ে একদিন আবেদন নিয়ে হাজির হয় নোয়াখালী। ট্রেন থেকে নামার সময় ঘটে এক ভয়ানক কান্ড। টিউশনির দেড়শ টাকা নিয়ে বাড়ি থেকে বের হয়েছিল। সাথে পকেট কোনে আরো দুই টাকা। ত্রিশ টাকায় টিকেট কাটে। নোয়াখালী স্টেশনে গাড়ী থামার পর দেখে ফ্লাটফর্মের দিকের দরজাটা বন্ধ।বার কয়েক চেষ্টা করে খুলতে না পেরে পরের কামরা দিয়ে নামার জন্য পা বাড়ায়। যেই নামতে যাবে, মোবাইল কোর্টের লোকজন তাকে আটক করে। প্রথম শ্রেনীতে উঠার দায়ে ১২০ টাকা আদায় করে নেয়। হতভম্ব হয়ে স্টেশন ত্যাগ করে অনেক খোঁজাখুজি করে কাঙ্খিত ঠিকানায় গিয়ে দেখে তা বন্ধ। সেদিন রোজা শেষে দুই টাকার মুড়ি কিনে ইফতারী করে যখন বাড়ি ফিরে রাত অনেক হয়ে যায়।
একটি সরকারী প্রতিষ্ঠানে বেশ কিছু লোক নিয়োগের জন্য বিজ্ঞপ্তি দেয়। ফের আবেদন করে। অনেক দিন পার হয় ইন্টারভিউ কার্ড আসেনা। আসেনা তো আসেনা।এরি মাঝে আরেকটি সরকারী প্রতিষ্ঠানে আবেদন করে। লোক মুখে শুনেছে এই চাকুরী পেতে হলে বড় অংকের টাকা দিতে হবে। টাকা দেয়ার সামর্থ্য তার বাবার নেই। তবু আশায় থাকে।
গ্রামের রাস্তায় বের হলে লোকজন নানা বিরক্তিকর মন্তব্য করে।"দেখ ছেলেটা কত লেখা পড়া করেছে,চাকুরী নাই;আরে এ দেশে মামা দুলাভাই না থাকলে কি আর চাকুরী মেলে? এখন ঘুর। না হালের হয়েছে না হয়েছে জোয়ালের। বাপটা খেটে মরছে উনি নবাবজাদা হয়ে ঘুরে বেড়ান।" এসব শুনতে আর ভাল লাগেনা তাই বাড়ি থেকে বের হওয়া অনেকটা বন্ধ করে দেয়।
একদিন পত্রিকার পাতায় একটি খরব দেখে চোখ আটকে যায় আমীর উদ্দিনের। একটি বেসরকারী ফাউন্ডেশন এইচ এস সি পাশ থেকে শুরু করে এম এ পাশ বেকারদের জন্য বিশেষ এক কর্মসূচী হাতে নিয়েছ। তাদের প্রতিষ্ঠানে চাকুরী করার পাশাপাশি পড়াশোনাও করা যাবে। তাদের পলিসি দেখে আগ্রহী হয়ে আবেদন করে।
তিনটা ইন্টারভিউ কার্ড একসাথে আসে। বুধবার দিন বেসরকারী প্রতিষ্ঠানে সাক্ষাতকার;বৃহস্পতিবার দীর্ঘদিন পূর্বে আবেদন করা প্রতিষ্ঠানের ইন্টারভিউ চট্টগামে আর শুক্রবারে অন্যটার পরীক্ষা কুমিল্লায়। নিজের টিউশনির কিছু টাকা এবং মায়ের কাছ থেকে কিছু নিয়ে রওয়ানা দেয়।
ঢাকায় সাক্ষাতকারের সময় ৪ টা এক ঘন্টা পূর্বেই সেখানে পৌছে। প্রতীক্ষার শেষ হয় সন্ধে সাতটায়। ফাউন্ডেশন প্রধান নাকি অন্য একটি মিটিংয়ে ছিলেন।আমীর উদ্দিনের সাক্ষাতকার শেষে তারা গ্রিন সিগনাল দিয়ে চলে যেতে বলেন। রাতের ট্রেনে চট্ট্রগ্রাম রওয়ানা দেয়।সারারাত না ঘুমিয়ে গাধাগাধি করে বসে থেকে সকালে পৌছে। অচেনা জায়গা চিনতে অনেক কষ্ট হয়। পকেটে অর্থের অভাবে পা দু’টোকেই বাহন বানিয়ে পথ খুঁজতে হয়। দুই ঘন্টা দেরিতে শুরু হওয়া পরীক্ষা শেষ হয় বিকেল ৪ টায়। ফেরত ট্রেন ধরতে হেঁটে পাহাড়তলী আসে। ট্রেন এখানে থামেনা শুনে আবার হেঁটে র্ওয়না দেয় বটতলী স্টেশনে।
রাত আটটায় একপ্রকার যুদ্ধকরে মেইল ট্রেনে উঠে। জীবনে এক নতুন অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হয় এখানে।কিছু দালাল গোছের লোক আগেই ট্রেনে উঠে সিট দখল করে বসে আছে।যাত্রীদের কাছে টাকার বিনিময়ে বিক্রি করে। পুলিশও কম যায়না। তার ও টাকার বিনিময়ে একটি বগিতে লোক তুলছে। দুই দিনের কর্মক্লাতিতে ট্রেনে উঠার পরই ঘুমে চোখ বুঝে আসে। কিন্তু ঘুমাতে পারেনা যদি ট্রেন কুমিল্লা ছেড়ে চলে যায়। রাত একটায় ট্রেন থেকে নামে। চোখের পাশাপাশি শরীরেও ক্লান্তি ঝেঁকে বসে। একটি বিশ্রাম কক্ষে চেয়ারে হেলান দিয়ে ঘুম দিতেই এক পুলিশ ধাক্কা দিয়ে তুলে দেয়। বসার সিটটাও হারায়।
ভারসাসম্যহীন শরীরে ঝিমিয়ে ঝিমিয়ে রাতাটা কাটিয়ে সকালে বৃষ্টিতে কাকা ভেজা হয়ে এক স্কুলে হাজির হয়। তার মত হাজার হাজার চাকুরী প্রার্থী পূর্বেই এসে বসে আছে। মাত্র কয়েকটা পোস্টের জন্য এত প্রার্থী!কার হবে চাকুরী ভেবে পায়না। পরীক্ষা শেষে বাড়ী চলে আসে।
আমীর উদ্দিন মনে মনে আশাবাদী হয়ে উঠে,এবার নিশ্চয় একটা চাকুরী হবে। আশাটাকে একধাপ এগিয়ে দিতে সেই বেসরকারী ফাউন্ডেশন থেকে চিঠি আসে। সেখানে উল্লেখ আছে সে নিবর্বাচিত হয়েছে। সকল মূল সার্টিফিকেট নিয়ে যেতে বলেছে তারা।
সেদিন শুক্রবার। সকালে কাঙ্খিত ঠিকানায় হাজির হয় ।পাঁচজন মানুষ তাকে নানা প্রশ্ন করে। শেষে তারা নিশ্চিত ভাবে জানায় সে নির্বাচিত হয়েছে। চাকুরী করবে পাশাপাশি এম বিএ পড়বে। বেতন হিসেবে মাসে পাঁচ হাজার টাকা দেয়া হবে। সেখান থেকে পড়াশোনার ফি হিসেবে আড়াইহাজার টাকা কেটে নেয়া হবে।দিনের প্রথম দিকে পড়াশোনা করবে বিকেলে করবে চাকুরী। আগামীকালই সে যোগদান করতে পারবে।এ জন্য তাকে প্রথমে পাঁচ হাজার টাকা দিয়ে ভর্তি হতে হবে।
টাকার কথা শুনে ব্যর্থ মনোরথে অফিস ত্যাগ করে।
একপশলা বৃষ্টি হয়।রাস্তা ঘাটেও পানি জমে।
পার্কের এক কোনে একটি বেঞ্চে বসে আমীর উদ্দিন। আজ বড় আশা নিয়ে এসেছিল। এখন আর কিছুই ভাবতে পারছেনা। কেন লেখাপড়া করেছিল ভেবে পাচ্ছেনা। ছোট বেলায় বাবার সাথে কাজে লেগে গেলেই বরং ভাল হত। বাবার উপর ধকলটা কম পড়ত।নানা সব চিন্তা মাথায় ভর করে।
তার সামনে বেশ কিছু পানি জমে আছে।মৃদু বাতাসে পানিতে ছোট ঢেউয়ের সৃষ্টি হয়েছে এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকলে মনে হয় যেন ছোট্ট এক নদী। পানি দেখে ছোট বেলার কথা মনে পড়ে গেল। বর্ষাকালে বৃষ্টির পর যখ তাদের উঠানে পানি জমত কাগজের নৌকা বানিয়ে ভাসাত।বৃষ্টির পানির স্রোতে নৌকাগুলো উঠানের এ মাথা থেকে ওই মাথায় ভেসে বেড়াত। সে স্মৃতি মাথা চারা দিয়ে উঠে। আমীর উদ্দিন হাতের ফাইলটা খুলে একটা করে সার্টিফিকেট বের করে আর একেকটা নৌকা তৈরি করে।একে একে সব গুলো পানিতে ভাসিয়ে দেয়।মৃদু বাতাসের পরশে নৌকাগুলো ধীর গতিতে দূরে চলে যেতে থাকে। আমীর উদ্দিন দেখতে পায় তার মনের জমাট বাধা কষ্টের পাহাড় নিয়ে নৌকা গুলো চলে যাচ্ছে।